সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য

পিতা-মাতা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তাঁরা সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেন। সন্তান যেন সুশিক্ষিত, সুসন্তান, নৈতিক ও ধার্মিক মানুষ হয়, এজন্য পিতা-মাতার করণীয় অপরিসীম। ইসলামে যেমন সন্তানদের পিতা-মাতার হক আদায় করার নির্দেশ রয়েছে, তেমনি পিতা-মাতারও সন্তানের প্রতি একাধিক গুরু দায়িত্ব রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে, মনস্তত্ত্ব এবং সমাজ বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তানদের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য
- অধ্যায় ১: সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কুরআনের আলোকে
◉ সূরা আত-তাহরীম (৬৬:৬):
> “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর…”
🔹 এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করা এবং জাহান্নামের পথ থেকে দূরে রাখা।
◉ সূরা আল-আহকাফ (৪৬:১৫):
> “…তারা বলে, হে আমার রব! আমাকে অনুপ্রাণিত করুন, যেন আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি… এবং আমার সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি…”
🔹 এই আয়াতে একজন মুমিন বাবা-মার দোয়ার মধ্য দিয়ে সন্তানদের জন্য হিদায়াত প্রার্থনার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
- অধ্যায় ২: হাদীসে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব
১. সন্তানের ভালো নাম রাখা
🔸 হাদীস:
> “তোমরা তোমাদের সন্তানদের জন্য ভালো নাম রাখো, কারণ কিয়ামতের দিন তাদেরকে সেই নামেই ডাকা হবে।”
— (আবু দাউদ)
২. আকীকা করা
🔸 হাদীস:
> “প্রতিটি সন্তান তার আকীকাহর মাধ্যমে বন্ধক থাকে।”
— (তিরমিযী)
৩. দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া
🔸 হাদীস:
> “তোমাদের প্রত্যেকে একজন রাখাল এবং প্রত্যেকে তার পালিতদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”
— (সহীহ বুখারী)
৪. আদব শিক্ষা দেওয়া
🔸 হাদীস:
> “কোনো পিতা তার সন্তানের জন্য উত্তম চরিত্রের চেয়ে উত্তম কিছু দিতে পারে না।”
— (তিরমিযী)
- অধ্যায় ৩: সন্তানের প্রতি ১০টি প্রধান দায়িত্ব
১. সন্তান জন্মের পর আজান দেওয়া
নবী করীম (সা.) তাঁর দৌহিত্র হাসান (রাঃ)-এর কানে আজান দিয়েছিলেন। এটি সন্তানের প্রথম শ্রবণীয় শব্দ যেন “আল্লাহু আকবার” হয়।
২. নাম রাখা ও আকীকা
একজন সন্তানের পরিচয় হয় তার নামের মাধ্যমে, যা তার চরিত্র গঠনের ভিত্তি।
৩. খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান
প্রয়োজনীয় ভরণপোষণ নিশ্চিত করা পিতা-মাতার মৌলিক কর্তব্য।
৪. শিক্ষা ও দ্বীন শেখানো
পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে কুরআন, নামাজ, হালাল-হারাম, আদব-আখলাক শেখানো।
৫. নৈতিকতা ও শিষ্টাচার শেখানো
সৎ, নম্র, সত্যবাদী ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা।
৬. খেলাধুলা ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ
শারীরিক সুস্থতাও সন্তানের অধিকার। খেলাধুলা, ব্যায়াম ও বিশ্রামের সুযোগ দিতে হবে।
৭. নিরাপদ ও ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা
ঘরের পরিবেশ শিশুর মন ও চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৮. কিশোর বয়সে বন্ধুর মতো আচরণ
এই বয়সে সন্তানদের বেশি ভালোবাসা ও বোঝার প্রয়োজন। না হলে তারা বিপথে যেতে পারে।
৯. বিবাহের বয়সে সঠিক পাত্র-পাত্রীর ব্যবস্থা
যুবক-যুবতীর জন্য ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে চরিত্র রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে।
১০. মৃত্যুর পর সন্তানের দোয়া পাওয়ার যোগ্য হওয়া
যদি সন্তানের মাঝে ভালো আদব-আখলাক থাকে, তবে সে পরকালে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করবে।
হাদীস:
“মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিসের মাধ্যমে তা চলমান থাকে: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে উপকার পাওয়া যায়, ও নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” — (সহীহ মুসলিম)
- অধ্যায় ৪: সন্তানকে ধর্মহীনতা ও দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অশ্লীলতা ও ধর্মহীনতা শিশুদের নষ্ট করছে। পিতা-মাতার দায়িত্ব—
নজরদারি রাখা
ভালো বন্ধু পরিবেশ নিশ্চিত করা
নিয়মিত নামাজ পড়া শেখানো
আল্লাহর ভয় ও জান্নাত-জাহান্নামের ধারণা দেওয়া
- অধ্যায় ৫: ইসলামী ইতিহাসে দৃষ্টান্ত
◉ হযরত ইমাম মালিক (রহঃ)
তাঁর মায়ের আদর্শ শিক্ষা ও দ্বীনের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছিল। তিনি বলেছেন, “আমার মা ছিলেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা।”
◉ হযরত ইমাম শাফী (রহঃ)
তাঁর মায়ের উৎসাহ ও কুরআন শিক্ষার জন্য তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, যা তাঁকে মুহাদ্দিস বানিয়েছে।
- অধ্যায় ৬: সন্তান বড় হলে পিতা-মাতার দায়িত্ব
✅ তাদের বন্ধু হওয়া
✅ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাহায্য করা
✅ চাকরি, বিয়ে, ব্যবসা– এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া
✅ অভিশাপ না দিয়ে দোয়া করা
🔹 হাদীস:
“তিনটি দোয়া কবুল হয়– এক: পিতা-মাতার দোয়া সন্তানের জন্য…” — (তিরমিযী)
- অধ্যায় ৭: সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা
🔸 হাদীস:
“সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো, যদি তুমি উপহার দাও তবে সকলকেই দাও।” — (সহীহ মুসলিম)
একজন পিতা-মাতার জন্য এটা জরুরি যে তারা কোনো সন্তানকে বেশি ভালোবাসে বা বেশি অবহেলা না করে।
উপসংহার
সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ও দায়িত্ব। এই সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন করা পিতা-মাতার উপর ফরজ দায়িত্ব। কুরআন ও হাদীসে এর সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে। আজকের সমাজে যদি আমরা আমাদের সন্তানদের দীনদার, চরিত্রবান, সম্মানিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে পিতা-মাতার কর্তব্য পালন করতে হবে আন্তরিকতা ও ধার্মিকতার সাথে।
“আপনি যদি চান আপনার সন্তান দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হোক, তবে আজ থেকেই তাকে দ্বীনি শিক্ষা, ভালোবাসা ও শুদ্ধ আদর্শে বড় করে তুলুন।”
আপনার মতামত দিন: আপনার মতে সন্তানকে মানুষ করতে পিতা-মাতার কোন কর্তব্য সবচেয়ে বেশি জরুরি?
শেয়ার করুন — যেন অন্য পিতা-মাতারাও উপকৃত হয়
নিয়মিত ইসলামিক ও নৈতিক লেখা পড়তে ভিজিট করুন: nextinfobd.com