মহররম মাসে কী কী নিষিদ্ধ

হিজরি সালের প্রথম মাস “মহররম”। এটি চারটি সম্মানিত মাসের একটি, যা কুরআন ও হাদীসে বিশেষভাবে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত। এই মাসে নেক আমল যেমন অধিক সওয়াবের, তেমনি গুনাহ ও বিদআতমূলক কাজও ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান যেখানে সবকিছু সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। আজকের আলোচনায় আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে মহররম মাসে কী কী কাজ নিষিদ্ধ ও পরিত্যাজ্য, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করব।
মহররম মাসে কী কী নিষিদ্ধ
- কুরআন ও হাদীসে মহররমের মর্যাদা
আল্লাহ বলেন:
> “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সঠিক জীবনব্যবস্থা। সুতরাং এই মাসগুলিতে নিজেদের উপর জুলুম করো না।”
📚 (সূরা আত-তাওবা: ৩৬)
এই আয়াতে ‘সম্মানিত মাস’ বলতে রজব, যুলক্বাদা, যুলহিজ্জা এবং মহররম বোঝানো হয়েছে।
মহররম মাসে নিষিদ্ধ কাজসমূহ (তাফসীর ও হাদীস অনুযায়ী)
১. আত্ম-অহিংসা ও শরীরে আঘাত করা
কারবালার শোক পালনের নামে শরীরে আঘাত করা, রক্ত বের করা সম্পূর্ণভাবে হারাম।
> “তিনি (আল্লাহ) আত্মহননের আদেশ দেননি; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।”
📚 (সূরা আন-নিসা: ২৯)
রাসূল (সা.) বলেছেন:
> “আমাদের দলভুক্ত নয় সে ব্যক্তি, যে মুখে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে ফেলে ও জাহেলিয়াতের আহ্বান জানায়।”
📚 (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
উপসংহার: শরীরে আঘাত, রক্ত ঝরানো, মাথা ফাটানো – এগুলো শরীয়তবিরোধী, বিদআত এবং কবিরা গুনাহ।
২. মাতম ও শোকানুষ্ঠান
মহররমে কেউ কেউ শোকসভা করে, কান্নাকাটি করে, “ইয়া হোসাইন! ইয়া হোসাইন!” বলে চিৎকার করে।
> “মৃতের জন্য বিলাপকারী নারী যদি মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে, তবে সে কিয়ামতের দিন বোরকা পরিহিত অবস্থায় উঠবে, যা আগুনে তৈরি হবে।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ৯৩৫)
উপসংহার: ইসলাম শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধতা দিয়েছে। অতিরিক্ত বিলাপ, চিৎকার, শোকমিছিল শরীয়তের পরিপন্থী।
৩. বিদআতী আমল ও কুসংস্কার
বিভিন্ন সমাজে মহররমে কিছু কাজ প্রচলিত রয়েছে যেগুলোর কোন ভিত্তি নেই:
হালুয়া-রুটি রান্না করা
বিশেষ দোয়া বা শিরনী
“গাজী ভাইয়ের ঘোড়া” নামক মিথ্যা রেওয়াজ
নিশারত, চেহলাম, ১০ দিনব্যাপী মজলিস ইত্যাদি
📚 রাসূল (সা.) বলেন:
> “যে ব্যক্তি আমার এই দীন বা শরিয়তে এমন কোনো কাজ যুক্ত করে যা এ দীন নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।”
📚 (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
৪. আশুরার দিনে বিয়ের আয়োজন বর্জন করা
অনেকে বিশ্বাস করে ১০ মহররমে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। অথচ এ বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি কুরআন বা হাদীসে নেই। এটি কুসংস্কার।
📌 উপসংহার: বিয়ে বা যেকোনো হালাল কাজ এই মাসে করতে পারা ইসলামে বৈধ। ধর্মের নামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা বিদআত।
৫. কুরআন ও হাদীসবিহীন ইতিহাস প্রচার
অনেকে আশুরা নিয়ে ভ্রান্ত কাহিনী ছড়ায়:
১০ মহররমে কেয়ামত হবে!
এই দিনে নবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন!
এই দিনে জিন্নাত সৃষ্টি হয়েছে!
📌 এসব বিশ্বাস কুরআনের বিরুদ্ধে এবং ভিত্তিহীন। ইসলাম নির্ভর করে সহীহ দলিল ও তথ্যের উপর।
৬. আশুরা উপলক্ষে নির্দিষ্ট রান্না বা খাবার তৈরি করা
বিভিন্ন অঞ্চলে আশুরার দিন “হালুয়া-রুটি” রান্নার রেওয়াজ রয়েছে, যা অনেকেই সওয়াব মনে করেন।
কিন্তু হাদীসে এমন কোনো আমলের উল্লেখ নেই। বরং এটি কুসংস্কার ও বিদআত।
📌 ইসলাম আমল নির্ধারণ করেছে কুরআন ও রাসূলের হাদীসের আলোকে, সমাজের রীতির আলোকে নয়।
৭. মহররম মাসকে “অশুভ” মনে করা
অনেকেই বিশ্বাস করে মহররমে নতুন কাজ শুরু করা নিষেধ, বিয়ে, ভ্রমণ, ব্যবসা শুরু করলে বিপদ হবে।
এটা একান্তই অজ্ঞতা।
> “কোনো কালের মধ্যেই অমঙ্গল নেই।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ৫৮৭৭)
উপসংহার: সময় বা মাসকে অশুভ মনে করা জাহেলিয়াতের অংশ, ইসলাম তা নিষিদ্ধ করেছে।
৮. কবর জিয়ারতের নামে মিছিল ও লোক দেখানো অনুষ্ঠান
অনেকে আশুরার দিনে কবরস্থানে গিয়ে দলবদ্ধভাবে মিছিল করে, সাদা পোশাক পরে কান্নাকাটি করে।
📌 অথচ কবর জিয়ারত ব্যক্তিগত ইবাদত। কাঁদা, চিৎকার করা, ফুল দেওয়া বা মোমবাতি জ্বালানো সব বিদআত।
- কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী সতর্কতা
🔴 “…এই সম্মানিত মাসগুলোতে নিজের উপর জুলুম করো না।”
📚 (সূরা আত-তাওবা: ৩৬)
🔴 “প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহি এবং গোমরাহি জাহান্নামে নিয়ে যায়।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ৮৬৭)
📌 তাই এই পবিত্র মাসে আমাদের উচিত নিজেকে বিদআত, গুনাহ ও কুসংস্কার থেকে দূরে রাখা।
- মহররম মাসে সুন্নাহসমূহ ও করণীয়
✅ করণীয় ❌ বর্জনীয়
আশুরার দিনে ৯-১০ বা ১০-১১ মহররম রোযা রাখা শরীরে আঘাত, মাতম
বেশি বেশি ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াত বিদআতি মজলিস
সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকার শিক্ষা গ্রহণ কুসংস্কারমূলক রান্না
দান-সদকা করা, গরীবদের খাওয়ানো সময়কে অশুভ মনে করা
ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া কবরস্থানে মাতম ও শোকানুষ্ঠান
উপসংহার
মহররম মাস সম্মানিত ও বরকতময় একটি সময়, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। তবে এই সম্মানিত মাসকে ঘিরে সমাজে যেসব বিদআত, শোকপ্রথা, মাতম, শরীর জখম ইত্যাদি প্রচলিত হয়েছে, সেগুলো ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
আমরা যেন এই মাসে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করি, গুনাহ থেকে বাঁচি এবং বিদআত থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করি। ইসলাম আমাদের সহজ, পরিপূর্ণ ও যুক্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা দিয়েছে – সেটাই অনুসরণ করাই হোক আমাদের কর্তব্য।
> 📖 আপনি যদি ইসলামিক মাসসমূহের ফজিলত, হাদীস ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিদআতের বিপদ সম্পর্কে আরও জানতে চান –
🌍 ভিজিট করুন: www.nextinfobd.com
🔄 বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন – দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে দিন।
Read more