১০ মহররমের ফজিলত কি কি

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এই দ্বীনের প্রতিটি মাস, দিন, এমনকি প্রতিটি মুহূর্তেই রয়েছে অপরিসীম ফজিলত ও রহমত। তবে কিছু সময়কে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে মর্যাদা দিয়েছেন। তেমনি এক মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো “১০ মহররম”, যেটি আশুরা দিবস নামে বেশি পরিচিত।

১০ মহররমের ফজিলত কি কি

  • মহররম মাস কী?

মহররম মাস হচ্ছে হিজরি বছরের প্রথম মাস। আল্লাহ তাআলা কুরআনে যে চারটি সম্মানিত মাসের কথা উল্লেখ করেছেন, তার একটি হলো মহররম। এটি “আল্লাহর মাস” হিসেবেও পরিচিত।

📖 আল্লাহ বলেন:

> إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا… مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ

“আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।”

— (সূরা তাওবা: ৩৬)

রাসূল (সা.) বলেন:

> أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم
“রামাদান মাস ছাড়া সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমে রোজা।”

— (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩)

  • ১০ মহররম (আশুরা) এর ফজিলত ও তাৎপর্য

১০ মহররম শুধু ইসলামের ইতিহাসেই নয়, পূর্ববর্তী নবীদের যুগেও গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত ছিল। এই দিনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা ইসলামি ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা পেয়েছে।

  •  আল্লাহর নিকট এই দিনটি মর্যাদাপূর্ণ

১০ মহররম বা আশুরা শুধু ইসলামে নয়, ইহুদি ধর্মেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত। কারণ এদিনেই মুসা (আ.)-কে ফেরাউন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

📖 হাদীস:

> “রাসূল (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন দেখলেন যে ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘তোমরা এই দিনে রোজা রাখো কেন?’
তারা বলল: ‘এই দিনে মুসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে আল্লাহ মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন। তাই আমরা আনন্দ প্রকাশ করতে রোজা রাখি।’
রাসূল (সা.) বলেন: ‘আমরা মুসার অধিক হকদার।’ তারপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবাদেরও আদেশ দিলেন।”

— (সহিহ বুখারি: ২০০৪, সহিহ মুসলিম: ১১৩০)

  • এই দিনে এক বছর পূর্বের গুনাহ মাফ হয়

📖 হাদীস:

> “সিয়ামু ইয়াওমে আশুরা, আহতাসিবু আলাল্লাহ আন ইউ কাফফিরা সানাতাল্লাতি ক্বাবলাহু”
“আশুরার রোজা রাখলে আমি আশা করি, আল্লাহ তা’আলা বিগত এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।”

— (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

এটি প্রমাণ করে যে, আশুরার রোজা শুধু নফল নয়, বরং তা অশেষ ফজিলতপূর্ণ।

  • এদিনে বহু নবী-রাসূলের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে

ইসলামী ইতিহাসবিদ ও আলেমগণের মতে, ১০ মহররমে সংঘটিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা:

📅 ঘটনাবলী বিবরণ

🌊 নূহ (আ.) মহাপ্লাবনের পরে জুদি পাহাড়ে তাঁর নৌকা থেমেছিল এই দিনে।
🔥 ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে এই দিনে রক্ষা পান।
🌊 মুসা (আ.) বনি ইসরাইলসহ ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি পান।
🩸 হুসাইন (রা.) কারবালায় নির্মমভাবে শহীদ হন ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে।

  • আশুরা ও কারবালা ট্র্যাজেডি

হযরত হুসাইন (রা.) ছিলেন রাসূল (সা.) এর প্রিয় দৌহিত্র। ১০ মহররম ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শহীদ করা হয়। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য চরম বেদনার দিন।

হুসাইন (রা.) সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন।

📖 রাসূল (সা.) বলেন:

> “আল হাসান ওয়াল হুসাইন সাইয়িদা শাবাবি আহলিল জান্নাহ।”
“হাসান ও হুসাইন জান্নাতি যুবকদের নেতা।”

— (তিরমিযি: ৩৭৬৮)

  • কারবালার শিক্ষা:

➡ সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা
➡ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো
➡ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকা

আশুরার রোজা পালন করার পদ্ধতি

➤ একা ১০ তারিখ রোজা না রেখে ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা উত্তম।

📖 রাসূল (সা.) বলেন:

> “আগামী বছর আমি ইনশাআল্লাহ ৯ তারিখেও রোজা রাখবো।”

— (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)

অনেক ইসলামিক স্কলার বলেন, যেন ইহুদিদের অনুকরণ না হয় — সে জন্য ১০ মহররমের রোজার সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখও যুক্ত করতে বলা হয়েছে।

  • আশুরার দিনে করণীয় ও বর্জনীয়

✅ করণীয়:

1. রোজা রাখা

2. বেশি বেশি ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত

3. তওবা ও ইস্তিগফার

4. দান-সদকা

5. গরিবদের সাহায্য করা

6. পরিবারের জন্য বিশেষভাবে খরচ করা (হাদীস অনুযায়ী বরকতের আশ্বাস রয়েছে)

  • রাসূল (সা.) বলেন:

> “যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ বৃদ্ধি করে, আল্লাহ তাআলা সারা বছর তার রিজিক বৃদ্ধি করবেন।”

— (বায়হাকি: ৯/৩০০)

❌ বর্জনীয়:

1. শুধু শোক পালনের নামে মাতম করা

2. শরীর আঘাত করা

3. গান-বাজনা, অপসংস্কৃতিতে অংশ নেওয়া

4. বিদআতমূলক রসম-রেওয়াজ পালন করা

মহররম মাসের শিক্ষা

নতুন হিজরি বছরের শুরুতে আত্মসমালোচনা করা

গত বছরের গোনাহগুলো মাফ করিয়ে নতুনভাবে আত্মশুদ্ধির পথ বেছে নেওয়া

সাহস, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও সত্যের প্রতি অবিচলতা শেখা

হুসাইন (রা.)-এর কুরবানি থেকে আদর্শ গ্রহণ করা

  • আশুরা সম্পর্কিত কিছু কবিতা ও ছন্দ

📝 কবিতা ১:

আশুরা দিনে ত্যাগের গান,
হুসাইনের রক্তে লেখা মান।
সত্যে বলিষ্ঠ, মিথ্যা দূর,
কারবালা দেয় সে শিক্ষা পুর।

📝 কবিতা ২:

মহররম মাসে রহমতের ঢল,
আশুরায় ত্যাগের দেয় উদাহরণ চল।
রোজা, তওবা, দান আর দয়া,
জীবনে আনুক আল্লাহর মায়া।

উপসংহার

১০ মহররম ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এ দিনে নবী-রাসূলদের মুক্তির কাহিনী যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস। আমাদের কর্তব্য এই দিনটির ফজিলত বোঝা, আমল করা, বিদআত থেকে বেঁচে থাকা এবং হুসাইন (রা.)-এর ত্যাগের শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করা।

 এই লেখা আপনার জন্য উপকারী মনে হলে, দয়া করে শেয়ার করুন। আরও ইসলামিক, ইতিহাসভিত্তিক এবং শিক্ষণীয় লেখার জন্য ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট: nextinfobd.com

সূত্র: কুরআন, সহীহ হাদীস, ইসলামিক স্কলারদের ব্যাখ্যা, ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ

দোয়া করি, আল্লাহ আমাদেরকে আশুরার ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button