মহররম মাসের ফজিলত ও আমল

ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাস এক পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মাস। এটি হিজরি বর্ষের প্রথম মাস, যার মধ্যে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা, শিক্ষা ও ফজিলত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই মাসকে সম্মানিত করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসে রোযা রাখা ও নেক আমলের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন।
এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে মহররম মাসের ফজিলত, আমল, শিক্ষণীয় বিষয়, কবরী ইতিহাস এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
মহররম মাসের ফজিলত ও আমল
- মহররম মাসের পরিচিতি
> “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি, আল্লাহর কিতাবে (লওহে মাহফুযে) যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।”
📚 (সূরা আত-তাওবা: ৩৬)
এই চারটি মাসের মধ্যে মহররম অন্যতম। এটি আশহুরুল হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহের একটি, যেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল এবং গুনাহের শাস্তিও অনেকগুণ বৃদ্ধি পেত।
মহররম মাসের ফজিলত
- ১. এটি আল্লাহর মাস
> “আল্লাহর মাস মহররম।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ১১৬৩)
রাসূল (সা.) নিজেই এ মাসকে আল্লাহর মাস বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর নামের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনো সময় বা বস্তু বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
- ২. এই মাসে রোযার বিশেষ ফজিলত
> “রমজান মাস ব্যতীত আল্লাহর মাস মহররমে রোযা রাখার তুলনায় উত্তম কোনো রোযা নেই।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ১১৬৩)
রাসূল (সা.) এই মাসে নফল রোযা রাখতেন বেশি পরিমাণে, বিশেষ করে আশুরা দিবসে (১০ মহররম)।
- ৩. আশুরা দিবসের গুরুত্ব
আশুরা অর্থ “দশম দিবস”। ১০ মহররম ইসলামি ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ:
> 🔹 হযরত মূসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ফেরাউন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
🔹 ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন।
🔹 এই দিনে বহু নবীর কষ্ট ও বিজয়ের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
🔹 হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাতও ঘটে এই দিনে।
- আশুরার ঐতিহাসিক পটভূমি
রাসূল (সা.) যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন দেখতে পান ইয়াহুদিরা ১০ মহররম রোযা রাখছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কেন রোযা রাখে? তারা বলল:
> “এই দিন আল্লাহ মূসা (আ.) ও তার কওমকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন। এজন্য আমরা রোযা রাখি।”
রাসূল (সা.) বললেন:
“আমরা মূসার অধিক হকদার।”
📚 (সহীহ বুখারী: ২০০৪)
এ সময় তিনি নিজেও রোযা রাখলেন এবং সাহাবাদেরও তা রাখতে বললেন।
মহররম মাসের আমল
- ১. নফল রোযা রাখা
সর্বাধিক ফজিলতের রোযা:
৯ ও ১০ মহররম
অথবা ১০ ও ১১ মহররম
> “তোমরা আশুরার দিনে রোযা রাখো এবং ইহুদীদের বিরুদ্ধাচরণ করো; একদিন পূর্বে অথবা একদিন পরে রোযা রেখো।”
📚 (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)
- ২. তাওবা, ইস্তিগফার ও দোয়া
এই মাসে নেক আমল করা, গুনাহ মাফ চাওয়া, বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
- ৩. গরীব-দুঃখীকে সাহায্য
আশুরা দিবসে গরীবদের খাওয়ানো, দান-সদকা করা বরকতময়। হাদীসে এসেছে:
> “যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণে প্রশস্ততা করবে, আল্লাহ তাকে সারাবছর প্রশস্ততা দান করবেন।”
📚 (বাইহাকী: ৩/৩৪০)
- ৪. হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) ও কারবালার শিক্ষা স্মরণ
শোক নয়, বরং শিক্ষা গ্রহণ করাই ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম। ত্যাগ, সত্যের পথে অটল থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দীক্ষা রয়েছে কারবালায়।
- মহররম মাস ও কিছু ভুল প্রথা
মহররমের নামে অনেক সমাজে প্রচলিত রয়েছে কিছু বিদআত ও অমূলক কাজ:
❌ ১. নিজ শরীরে আঘাত করা
ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর শোক পালন করতে গিয়ে অনেকেই নিজেদের শরীরে আঘাত করে যা শরিয়তসম্মত নয়।
> “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।”
📚 (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
❌ ২. বিদআতী মজলিস আয়োজন
মহররমে এমন কিছু দুঃখ আয়োজন হয় যার কোনো ভিত্তি কুরআন বা সহীহ হাদীসে নেই।
❌ ৩. রান্না-বান্না, শিরনী, হালুয়া বিতরণ ইত্যাদি
আশুরার দিন হালুয়া খাওয়া, মিছরি বিতরণ এসব কোনো ইসলামী আমল নয় বরং সংস্কারভিত্তিক।
- কারবালার শিক্ষা
🌹 সত্যের পথে অবিচল থাকা
ইমাম হোসাইন (রাঃ) সত্য ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়িয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
🌹 অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো
ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান মুসলিম উম্মাহকে সাহস ও ন্যায়ের শিক্ষা দেয়।
🌹 দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা
কারবালার প্রান্তরে হোসাইন (রাঃ)-এর পরিবার দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখিরাতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
মহররম মাসে করণীয় ও বর্জনীয় (সারসংক্ষেপ)
✅ করণীয় ❌ বর্জনীয়
নফল রোযা রাখা (৯-১০ বা ১০-১১ মহররম) শরীর রক্তাক্ত করা
তাওবা, ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াত কবরের মিছিল, মাতম
দান-সদকা ও গরীবদের সহায়তা বিদআতি শোকসভা আয়োজন
শিক্ষা গ্রহণ ও ইতিহাস জানা রান্না-বান্না, বিশেষ খাবারের আয়োজন
- গুরুত্বপূর্ণ হাদীসসমূহ
১. “আশুরার রোযার দ্বারা বিগত বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)
২. “রমজান পরবর্তী সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ রোযা হচ্ছে মহররম মাসের।”
📚 (সহীহ মুসলিম: ১১৬৩)
- মহররম মাস আমাদের জীবনে কী শিক্ষা দেয়?
ঈমানের দৃঢ়তা
ত্যাগ ও সাহস
আখিরাতের গুরুত্ব
সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা
কান্না নয়, আত্মশুদ্ধির অনুপ্রেরণা
উপসংহার
মহররম মাস আমাদের একটি সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয় আত্মশুদ্ধি, গুনাহ থেকে মুক্তি, এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে আসার জন্য। আসুন আমরা কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী এই মাসকে সম্মান করি, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে বিরত থাকি এবং সত্য-ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার দীক্ষা গ্রহণ করি।
আপনি যদি ইসলামিক জ্ঞান, কুরআন ও হাদীসভিত্তিক প্রবন্ধ, এবং মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক বিষয়গুলো নিয়ে আরও জানতে চান – তাহলে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট:
www.nextinfobd.com
শেয়ার করুন – সওয়াবের অংশীদার হোন!
Read more
- মহররম মাসের ফজিলত ও আমল
- ১০ মহররমের ফজিলত কি কি
- মহররম মাসে কী কী নিষিদ্ধ
- মহররমের ১০ তারিখে কোন ঘটনা ঘটে
- মহররম মাসের রোজা কয়টি