প্রবাসীদের জন্য পেনশন

প্রবাসীরা আমাদের দেশের এক মহামূল্যবান সম্পদ। তারা বিদেশের মাটিতে পরিশ্রম করে দেশের জন্য রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন, পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফুটাচ্ছেন এবং দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিশ্রমের শেষ কোথায়? প্রবাসজীবনের অবসান ঘটলে তাদের ভবিষ্যৎ কী? আর্থিক নিরাপত্তার জন্য কোনো পেনশন, সরকারি সুরক্ষা বা পরিকল্পিত সঞ্চয়ের ব্যবস্থা কী আছে?

এই লেখায় আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব প্রবাসীদের পেনশন ব্যবস্থা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের পেনশন সুবিধা, বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।

প্রবাসীদের ভূমিকা ও অবদান

প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে প্রবাসীরা প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। এটি দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ গঠন করে।
তাদের অবদানে:

গ্রামীণ উন্নয়ন হয়

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়ে

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি আসে

কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরেও অবসরের পর প্রবাসীদের জীবনে নিরাপত্তার ঘাটতি লক্ষণীয়। ফলে ‘পেনশন’ বা অবসরের পর নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

পেনশন বলতে কী বোঝায়?

পেনশন হলো এমন একটি আর্থিক পরিকল্পনা যা অবসরের পর ব্যক্তিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ দেয়। এটি সাধারণত মাসিক ভিত্তিতে প্রদান করা হয়। দুইভাবে এটি কাজ করে:

1. সরকারি পেনশন (Public Pension) — সরকার প্রদত্ত

2. বেসরকারি পেনশন স্কিম (Private Pension Scheme) — বীমা/ব্যাংক/বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান পরিচালিত

বাংলাদেশে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য পেনশন থাকলেও, প্রবাসীদের জন্য এমন কোনো বাধ্যতামূলক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই।

প্রবাসীদের পেনশন কোথায় দরকার?

প্রবাসজীবনের একটি সময়ের পর:

বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা কমে যায়

দেশে ফেরার পর স্থায়ী জীবনের প্রয়োজন হয়

চিকিৎসা, আবাসন ও পরিবার খরচ বেড়ে যায়

এমন অবস্থায় যদি নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ না থাকে, তাহলে তাদের জীবনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তাই প্রবাসীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পেনশন ব্যবস্থার প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের জন্য পেনশন সুবিধা

 ১. সৌদি আরব:

সৌদি আরবে প্রবাসীরা সাধারণত পেনশন সুবিধা পান না। তবে যারা দীর্ঘমেয়াদে কাজ করেন এবং নিজেরা বেসরকারিভাবে সঞ্চয় করেন, তারা কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে গ্র্যাচুইটি বা ইনসুরেন্স সুবিধা পান।

 ২. সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE):

২০১৯ সালে ইউএই সরকার “Expats Pension Plan” চালুর কথা ঘোষণা করে, যাতে করে প্রবাসী কর্মীদের জন্য সঞ্চয়মূলক পরিকল্পনা চালু হয়।

 ৩. মালয়েশিয়া:

মালয়েশিয়ায় কাজ করা কিছু প্রবাসী EPF (Employees Provident Fund)-এর আওতায় থাকেন, যা একপ্রকার পেনশন প্ল্যান হিসেবেই কাজ করে।

 ৪. ইউরোপ (ইতালি, পর্তুগাল, ফ্রান্স ইত্যাদি):

বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশে বসবাসকারী প্রবাসীরা নির্দিষ্ট সময় কাজ করলে সেই দেশের আইন অনুযায়ী পেনশন সুবিধা পান।

 ৫. যুক্তরাজ্য ও কানাডা:

কাজের মেয়াদ ও ট্যাক্স রেকর্ড অনুযায়ী সরকারি পেনশন এবং CPP (Canada Pension Plan)-এর আওতায় অনেক প্রবাসী উপকৃত হন।

বাংলাদেশে প্রবাসীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা

বাংলাদেশ সরকার প্রবাসীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
২০২১ সালে ‘একীভূত ডিজিটাল পেনশন স্কিম’ ঘোষণা করা হয় যেখানে প্রবাসীরাও অনলাইনে নিবন্ধন করে মাসিক ভিত্তিতে টাকা জমা দিয়ে পেনশন সুবিধা পেতে পারেন।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন (http://www.upension.gov.bd)

মোবাইল ব্যাংকিং/রেমিটেন্সের মাধ্যমে অর্থ জমা

৬০ বছর বয়সে নির্দিষ্ট হারে মাসিক অর্থপ্রাপ্তি

মৃত্যুর পর নমিনিকে অর্থ প্রদান

এই স্কিম এখনো অনেকের অজানা এবং এর প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন।

বেসরকারি পেনশন স্কিম ও বিকল্প

বাংলাদেশে কিছু বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য সঞ্চয় ও পেনশন স্কিম চালু করেছে। যেমন:

প্রতিষ্ঠান সুবিধাসমূহ

Islami Bank Mudaraba Pension Scheme
NRB Bank NRB Monthly Income Scheme
BRAC Bank Probashi Deposit Scheme
Guardian Life Insurance Retirement Benefit Plan

এছাড়া, বীমা কোম্পানি ও বিদেশি বেনিফিট স্কিমেও অংশ নিতে পারেন অনেক প্রবাসী।

কীভাবে একজন প্রবাসী নিজেই পেনশনের ব্যবস্থা করতে পারেন?

যেহেতু অনেক দেশেই প্রবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক পেনশন নেই, তাই একজন সচেতন প্রবাসী নিম্নলিখিত কৌশলে নিজেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন:

🔸 ১. মাসিক সঞ্চয় প্ল্যান করুন

🔸 ২. জীবন বীমা বা রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান নিন

🔸 ৩. রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করুন (দেশে বাড়ি/জমি)

🔸 ৪. স্থায়ী ব্যবসা গড়ার চিন্তা করুন

🔸 ৫. সরকারি পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণ করুন

প্রবাসীদের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

চ্যালেঞ্জ:

প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তা

দেশে ফেরার পর বেকারত্ব

স্বাস্থ্যঝুঁকি

পরিবারিক চাপ

করণীয়:

সরকারি সচেতনতা বৃদ্ধি

পেনশন স্কিমের প্রচার

রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার আশ্বাস

বিদেশি দূতাবাসগুলোর অংশগ্রহণ

ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাবনা

1. প্রবাসীদের জন্য পৃথক জাতীয় পেনশন আইন প্রণয়ন করা উচিত

2. সকল দূতাবাসে পেনশন রেজিস্ট্রেশন সহায়তা কেন্দ্র থাকা উচিত

3. সরকারি-বেসরকারি যৌথ পেনশন প্রকল্প চালু করা যেতে পারে

4. রেমিটেন্সের একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে সঞ্চয় স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়

বাস্তব কিছু গল্প

গল্প ১:

মো. জাহাঙ্গীর আলম, মালয়েশিয়া প্রবাসী (২০ বছর):
“সারা জীবন পরিশ্রম করলাম। এখন বয়স ৬০, দেশে ফিরে বুঝলাম আমার কোনো সঞ্চয় নেই। যদি তখন থেকেই একটা পেনশন স্কিমে থাকতাম, আজ এমন হইত না।”

গল্প ২:

সেলিনা বেগম, সৌদি আরব থেকে ফিরে:
“১০ বছর কাজ করে দেশে ফিরেছি। ভাগ্য ভালো, আমি Islami Bank-এর পেনশন স্কিমে ছিলাম। এখন মাসে ১২ হাজার টাকা পাই। এটা আমার ভরসা।”

উপসংহার

প্রবাসীরা শুধু রেমিটেন্স পাঠানোর মেশিন নন। তারা একেকজন স্বপ্নবান মানুষ, যারা নিজের পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজেকে বিসর্জন দেন। এই মানুষগুলো যেন অবসরের পর দুঃখ-কষ্টে না থাকেন, তার জন্য প্রয়োজন সুসংহত ও বাস্তবসম্মত পেনশন পরিকল্পনা।

সরকারের উচিত, প্রবাসীদের কষ্ট লাঘব করতে নির্ভরযোগ্য পেনশন সেবা গড়ে তোলা। তেমনি, প্রবাসীদেরও উচিত নিজ থেকে পরিকল্পনা করে অর্থ সঞ্চয় ও নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করুন, মন্তব্য করুন।

> আপনি যদি একজন প্রবাসী হন, তাহলে আজই জেনে নিন কিভাবে ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ পেনশন গঠন করবেন। বিস্তারিত জানতে আমাদের ওয়েবসাইটে ঘুরে আসুন!

 বিস্তারিত পড়ুন: https://nextinfobd.com

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button