মহররম মাসের রোজা কয়টি

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে বছরের প্রতিটি দিন এবং মাসের রয়েছে আলাদা আলাদা গুরুত্ব ও ফজিলত। তেমনি হিজরি বছরের প্রথম মাস হলো মহররম, যাকে “আল্লাহর মাস” (شَهْرُ اللّٰهِ الْمُحَرَّمُ) বলা হয়। এই মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোজা (সাওম)। অনেকেই জানতে চান:

> “মহররম মাসে কয়টি রোজা রাখা উত্তম? কোন দিনগুলোতে রোজা রাখতে হয়? এই রোজার ফজিলত কতটুকু?”
এই লেখায় আমরা এসব প্রশ্নেরই জবাব খুঁজবো কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে।

মহররমের গুরুত্ব কোরআনের আলোকে

আল্লাহ তাআলা বলেন:

> إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا
“আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি…”
(সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৩৬)

এই ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাস বিশেষভাবে সম্মানিত। মহান আল্লাহ বলেন:

> مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ
“এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।”
(সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৩৬)

মহররম হলো সেই চারটি সম্মানিত মাসের একটি। তাই মহররম মাসের মর্যাদা অন্য যেকোনো সাধারণ মাসের চেয়ে অনেক বেশি।

হাদিসের আলোকে মহররম মাস ও রোজার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

> أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ، شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ
“রামাদানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।”
— (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, রামাদানের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ নফল রোজা হচ্ছে মহররম মাসের রোজা।

মহররম মাসে কয়টি রোজা রাখা হয়?

🔹 আশুরার দিন – ১০ই মহররম

১০ মহররম – যাকে “আশুরা” বলা হয়, এ দিনের রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

> صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
“আমি আশা করি, আশুরার রোজা (১০ মহররম) পূর্ববর্তী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেয়।”
— (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

🔹 ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম

ইহুদিদের সঙ্গে মিল না রাখার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার আগে ও পরে একদিন রোজা রাখতে বলেছেন।

তিনি বলেন:

> لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ
“আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তবে ৯ তারিখেও রোজা রাখবো।”
— (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)

সুতরাং উত্তম পদ্ধতি হলো:

৯ ও ১০ মহররম
অথবা

১০ ও ১১ মহররম
অথবা

৯, ১০ ও ১১ মহররম – তিনটি দিন রোজা রাখা।

  • সাহাবিদের আমল

ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন:

> “রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবাদেরও রাখতে আদেশ দিতেন।”
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

রামাদান ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। পরে এটি নফল হয়ে যায়, তবে ফজিলত অব্যাহত থাকে।

মহররমের রোজা কয়টি রাখা যায়?

মহররম মাসে পুরো মাসই রোজা রাখা যেতে পারে। তবে সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ দিনগুলো হলো:

1. ৯ মহররম (তাসুয়া)

2. ১০ মহররম (আশুরা)

3. ১১ মহররম

🔹 চাইলে আপনি পুরো মহররম মাসেই নফল রোজা রাখতে পারেন, কারণ হাদিসে এসেছে:

> “মহররম মাসে রোজা রাখা উত্তম।”

তবে ৯, ১০ ও ১১ এই তিন দিনের রোজা অধিক গুরুত্ব পায়।

  • রোজার ফজিলত সংক্ষিপ্তভাবে

দিন ফজিলত

১০ মহররম এক বছর আগের গোনাহ মাফ হয় (সহিহ মুসলিম)
৯ ও ১০ ইহুদিদের ভিন্নতা, সুন্নত রক্ষা (সহিহ মুসলিম)
পুরো মাস রমজানের পর শ্রেষ্ঠ মাসে নফল রোজা, অধিক সওয়াব (সহিহ মুসলিম)

  • মহররমের রোজা নিয়ে ভুল ধারণা

অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র ১০ মহররম রোজা রাখা যথেষ্ট, কিন্তু ইহুদি মিল এড়াতে নবী করিম ﷺ ৯ এবং ১০ কিংবা ১০ এবং ১১ তারিখ রোজা রাখতে বলেছেন। তাই একদিন নয়, কমপক্ষে দুইদিন রোজা রাখা উত্তম।

  •  মহররম মাসে রোজার শিক্ষা ও উপকারিতা

1. আত্মশুদ্ধি হয়

2. সামাজিক ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠে

3. আল্লাহর রহমত লাভ হয়

4. পূর্ববর্তী গোনাহ মাফ হয়

5. সিয়ামের প্রতি আগ্রহ বাড়ে

  • কিছু সুন্দর হাদিস ও বক্তব্য

📌 “আল্লাহর পথে একটি রোজা, জাহান্নামের আগুন থেকে ৭০ বছরের দূরত্ব সৃষ্টি করে।”
(সহিহ বুখারি)

📌 “আশুরার দিনে রোজা রাখা এমন যেন এক বছরের গোনাহ ক্ষমা।”
(সহিহ মুসলিম)

📌 “তোমরা রোজা রাখো, কারণ রোজা জান্নাতে নিয়ে যাবে।”
(তিরমিজি)

  • কিছু ইসলামী ছন্দ ও কবিতা (মহররমের রোজা নিয়ে)

> 🌙
আসে আশুরা স্মরণ করায়
ইতিহাসে আঁকা দুঃখের ছায়া।
রোজা রেখে ফেরে সে দিনে,
গুনাহ মোচন হয় নিশ্চিন্ত ভায়ে।

🌾নবী বললেন আশুরাতে,
গোনাহ মোচন হয়।
রোজা রাখো সে দিনে ভাই,
নাজাত পাবে কেউ নয়!

  • করণীয় ও সাবধানতা

✅ রোজা রাখার নিয়ত রাতে করে রাখুন।
✅ ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ – দুই দিন রোজা রাখুন।
✅ ভুল বিশ্বাস ও বিদআত থেকে বিরত থাকুন (যেমন শুধুমাত্র বিশেষ খাবার খাওয়া, ছুরি ঘোরানো ইত্যাদি)।
✅ রোজা রাখার পাশাপাশি কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তেগফার ও দুআ করুন।

উপসংহার

মহররম মাসে রোজা রাখা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। এটি আমাদের অতীত গোনাহ মাফ করায়, রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ দেয় এবং মুসলিম জীবনে আত্মশুদ্ধির সুযোগ এনে দেয়। ৯, ১০ ও ১১ মহররম — এ তিন দিনে রোজা রাখা সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ হলেও চাইলে পুরো মাসেই নফল রোজা রাখা যায়।

 আরও পড়ুন:

রমজান মাসের রোজার ফজিলত ও বিধান

রোজা না রাখার শাস্তি ও পরিণাম

ইসলামী মাসসমূহের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

🔗 লেখাটি পড়েছেন? শেয়ার করুন অন্যদের সঙ্গে!
আপনার মতামত জানান কমেন্টে।

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button